অনেকগুলি বছর আগের কথা। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে ট্রেন। সুরেশ স্বামীনাথ তাঁর স্ত্রী আর দশ বছরের ছেলেকে নিয়ে চলেছেন ইয়োকোহামা থেকে হিরোশিমায় কয়েক দিনের জন্য এক বিশেষ কাজে। সুরেশ স্বামীনাথ লক্ষ করছিলেন, তাদের উল্টোদিকে বসেছেন অতি বৃদ্ধ এক জাপানি ভদ্রলোক। তিনিও ইয়োকোহামা স্টেশন থেকে উঠেছেন। সারা মুখটা জুড়ে বার্ধক্যের ছাপ। রিমলেস চশমার ভিতরে তাঁর চোখ দুটি বেশ উজ্জ্বল। ট্রেন ছাড়ার পর থেকে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন কিছু একটা ভাবছেন!!
কিছুটা পথ অতিক্রম হবার পর উল্টোদিকে বসা ভদ্রলোকের সঙ্গে সুরেশ স্বামীনাথের পরিচয় হলো। ভদ্রলোকের নাম তাকাহাশি দাইসুকি। বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর বোঝা গেল, তাকাহাশির বিভিন্ন বিষয়ে রয়েছে পাণ্ডিত্য। পূর্বের এবং বর্তমানের অনেক খবরই তিনি জানেন। কথাপ্রসঙ্গে বিভিন্ন আলোচনার মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসায় হঠাৎ করেই তাঁর মুখ মণ্ডলের রূপ পরিবর্তন হয়ে তিনি চুপ করে গেলেন। মনে হলো, স্মৃতির জোয়ারে পিছিয়ে গেলেন বহু বছর পূর্বে। রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, আমরা প্রায় সকলেই কম - বেশি অবগত পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা ভাবলেই আমি ভীত হয়ে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলি কারন পূর্বের বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে আমাদের পরিবারের এক করুণ কাহিনী।
পরিবারের লোকজনদের থেকে শুনেছি, আমার জন্মের আগে থেকেই আমরা ছিলাম একান্নবর্তী পরিবার। আমাদের পরিবারের সবাই এক সঙ্গে হিরোশিমাতে এক গ্রামে বসবাস করত। বেশ আনন্দের মধ্যে দিনগুলি কেটে যেত। আনন্দময় দিনগুলির মধ্যে হঠাৎ করে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে এবং লোকজনদের আলোচনায় সবাই বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধের কারণ ছিল অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড সারায়েভোতে এক সার্বিয়ান সন্ত্রাসীর হাতে নিহত হবার জন্যে। এছাড়া সেই সময় ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদী উগ্রতা, সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব, গোপন জোট ইত্যাদি এই যুদ্ধের আর একটি কারণ। সংক্ষেপে এটাই ছিল পৃথিবীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।
যুদ্ধক্ষেত্রে সেই সময়কার নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। বিশেষ ভাবে ব্যবহৃত হয়ে ছিল মেশিনগান, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক এবং এক উন্নত ধরণের বিষাক্ত গ্যাস। যুদ্ধের ফলে শুরু হয়েছিল সারা ইউরোপজুড়ে প্রবল মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, এবং বহু মানুষের প্রাণহানি এবং মহামারী। এর ফলে শুরু হয় দুর্ভিক্ষ এবং এতে প্রচুর মানুষ মারা যান।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। ভার্সাই চুক্তি। এর মাধ্যমে জার্মানির ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়, যার মধ্যে ছিল যুদ্ধের দায়ভার, ভারী ক্ষতিপূরণ এবং সামরিক শক্তি হ্রাস করবার। এছাড়া জার্মানি কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমণ। যার ফলে পরবর্তীকালে আর একটি বিশ্বযুদ্ধের পরিবেশ ক্রমে সৃষ্টি হতে থাকে যার মধ্যে এটিও একটি অন্যতম কারন হয়ে ওঠে।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে স্মৃতির গভীর থেকে আর কিছু সঙ্গে নিয়ে এসে তাঁর উজ্জ্বল চোখ দুটি দিয়ে চারিদিকটা দেখে নিয়ে তাকাহাশি দাইসুকি আবার শুরু করলেন তাঁর কাহিনী। বিশ্বের মানুষজন পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রের মাধ্যমে আভাস পেলেন, আর এক বড় যুদ্ধ হতে চলেছে। অনুমান সত্যি হলো। শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সেই সময় আমি অনেকটাই বড়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রধানত ভার্সাই চুক্তির কারনে নাৎসি জার্মানির উত্থান ঘটে। এছাড়া জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এবং ইতালির ফ্যাসিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯, হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়। ইতিহাস বলে, এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পূর্বের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের থেকেও অনেক বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে তাকাহাশি দাইসুকি হাঁপাচ্ছিলেন। একটুক্ষণ সময় নিয়ে তিনি আবার বলা শুরু করলেন। মনে হচ্ছিল, বহু আগের কোন কষ্টদায়ক ছবি তাঁর মনের আয়নায় ভেসে উঠেছে। আমার পরিবারের লোকজন, আমার বাবা, মা, আমার স্ত্রী আর আমার অতি আদরের দুটি ছেলে মেয়ে তারা থাকতো হিরোশিমাতে। আমি কাজের সূত্রে থাকতাম ইয়োকোহামাতে। যুদ্ধ চলছে। স্কুল, কলেজ, বাজার প্রায় সমস্ত কিছু প্রায় বন্ধ। বিশেষ দরকার ছাড়া বাড়ির বাইরে বেরোনোর উপর কার্যত নিষেধাজ্ঞা জারি করা ছিল।
অবশেষে এলো সেই ভয়ঙ্কর দিনটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট। "লিটল বয়" নামে এক ভয়ঙ্কর পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হোল হিরোশিমাতে। সমস্ত শহরটি নিমেষের মধ্যে সম্পূর্ণ ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে গেলো। আমার সমস্ত প্রিয়জনদের মৃত্যু হলো। এরপর ৯ই আগস্ট ১৯৪৫ সালে নাগাসাকিতে "ফ্যাট ম্যান" নামে আবারো আর একটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের ফলে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছিল এবং শহরগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। চোখের জল মুছে নিয়ে দাইসুকি বললেন- অবশেষে যুদ্ধ থামলো। কিন্তু আমার মত অনেক মানুষের পরিবার চিরতরের জন্য পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল। সুরেশ স্বামীনাথের হাত দুটি ধরে দাইসুকি বলতে লাগলেন- বলুনতো, এই রকম যুদ্ধের কি কোন প্রয়োজন ছিল ? পরবর্তীতে এই যুদ্ধের ভয়াবহতা কথা মনে রেখে বিশ্বে জাতিসংঘ গঠন হয় যাতে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন যুদ্ধকে এড়ানো যায়।
আজ ৬ই আগস্ট। আমি প্রতি বছর এই দিনটিতে হিরোশিমাতে আসি যুদ্ধে মৃত মানুষজনদের প্রতি আমার ভালবাসা, শ্রদ্ধা আর প্রণাম জানাতে।
তাকাহাশি দাইসুকি নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গে বললেন- আমি নিজে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ রূপ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সাক্ষী থেকেছি। সেই অভিজ্ঞতার থেকেই বলছি, আমি কখনোই চাই না আবার প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত ঘটনা এই পৃথিবীতে পুনরায় ঘটুক। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ শক্তিধর উন্নত দেশগুলির হাতে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলির তুলনায় বহু অংশে উন্নত নানা ধরণের যুদ্ধে ব্যবহৃত জিনিষ আবিষ্কৃত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটলে পারমাণবিক ও উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহারের ফলে আধুনিক সভ্যতা ধ্বংস হতে পারে এবং সত্যি সত্যি যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তবে এর পরিণাম হবে আগের তুলনায় অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। পূর্বের যুদ্ধে সরাসরি জড়িত না থেকেও বিশ্বের অনেক দেশে পরোক্ষ ভাবে যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার ফলে সেইসব দেশের মানুষজনকে নানা দিক থেকে ভীষন ভাবে অসুবিধায় পড়তে হয়েছিল। অর্থনৈতিক অবস্থার বিপর্যয় ঘটে। সুতরাং আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চাই না। সংকট হতেই পারে। সেই সংকট আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা হোক। আমরা চাই শান্তি এবং প্রত্যেক দেশগুলির মধ্যে গড়ে উঠুক ভাতৃত্বের বন্ধন। একটা সময় ট্রেন হিরোশিমাতে এসে পৌছাল। বিদায় নেবার সময় তাকাহাশি দাইসুকি সুরেশ স্বামীনাথের হাতদুটি ধরে বললেন- আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা চাই শান্তি।
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই।
১২ আগষ্ট - ২০১৭
গল্প/কবিতা:
৫৪ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
আগামী সংখ্যার বিষয়
গল্পের বিষয় "বাবা”
কবিতার বিষয় "বাবা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মে,২০২৬